যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিতে বছরে ১৩২৭ কোটি টাকা ক্ষতি - NCB News24
ঢাকাবৃহস্পতিবার , ১২ মার্চ ২০২৬
  • আজকের সর্বশেষ সবখবর

    যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিতে বছরে ১৩২৭ কোটি টাকা ক্ষতি

    এনসিবি প্রতিবেদক কাউসার
    মার্চ ১২, ২০২৬ ১:০৫ অপরাহ্ণ


    বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সই হওয়া বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর হলে বছরে সরকারের প্রায় ১ হাজার ৩২৭ কোটি টাকার আমদানি শুল্ক রাজস্ব হারানোর শঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)। একই সঙ্গে এ চুক্তির কারণে বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) আওতাভুক্ত অন্যান্য দেশকেও একই ধরনের সুবিধা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি হতে পারে, যা ভবিষ্যতে বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে মনে করছে সংস্থাটি। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডি কার্যালয়ে আয়োজিত মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। এতে সূচনা বক্তব্য ও মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।

    মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনে ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি (অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড) সই করেছে বাংলাদেশ। চুক্তির আওতায় দেশটিকে সাড়ে ৪ হাজার পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিতে হবে। আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে আরও ২ হাজার ২১০ ধরনের পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেবে। এ কারণে বছরে সরকার আমদানি শুল্ক বাবদ প্রায় ১ হাজার ৩২৭ কোটি টাকার রাজস্ব হারাবে। চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রকে একতরফাভাবে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা দেওয়া হয়েছে, যা ডব্লিউটিওর নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এর ফলে ডব্লিউটিওর আওতায় সদস্য অন্যান্য দেশকেও একই সুবিধা দিতে বাংলাদেশের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

    তিনি বলেন, চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে নির্দিষ্ট পণ্য কেনার শর্ত রয়েছে। এ কারণে সরকারের ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অর্থাৎ এ চুক্তিতে রাজস্ব আয় ও সরকারি ব্যয়ের যে বিষয়টি রয়েছে, সরকারকে সেটা পুনর্মূল্যায়ন করা দরকার। প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে।

    অনুষ্ঠানে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বাণিজ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে, যা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। এই চুক্তির বিষয়বস্তু উন্মুক্ত করা প্রয়োজন। কারণ, এতে বেশ কিছু আর্থিক ঝুঁকির বিষয় রয়েছে।

    তিনি বলেন, চুক্তি বাস্তবায়নের বড় অংশ বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বেসরকারি খাতকে যদি যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানিতে উৎসাহিত করতে হয়, তাহলে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হতে পারে। না হলে তারা কেন যুক্তরাষ্ট্র থেকেই পণ্য আমদানি করবে—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। এ ছাড়া তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক, কোথা থেকে পণ্য কেনা যাবে বা যাবে না—এ ধরনের বিষয়ও এতে জড়িত, যা দেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নেও প্রভাব ফেলতে পারে।

    অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনার পর এ বিষয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ চাইলে চুক্তিটি পুনর্মূল্যায়ন করতে পারে।

     

    জ্বালানি তেলের বিষয়ে সিপিডির এই সম্মাননীয় ফেলো বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের তেলের দাম স্থানীয় বাজারে কতটুকু প্রতিফলিত হবে, সে ব্যাপারে সরকারের কাছে বিভিন্ন নীতি উপাদান (পলিসি ইন্সট্রুমেন্ট) রয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) মুনাফার বাইরেও জ্বালানির ওপর দেশে প্রায় ২০-২৫ শতাংশ বিভিন্ন ধরনের কর রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে সরকার এই কর কমিয়ে দাম নিয়ন্ত্রণের সুযোগ পায়। উদাহরণস্বরূপ, বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জ্বালানি আমদানিতে যে ২ শতাংশ অগ্রিম আয়কর ছিল, তা তুলে দেওয়া হয়েছে।

    বর্তমানে দেশে ডিজেল, অকটেন ও অন্যান্য জ্বালানির কয়েক সপ্তাহের মজুত রয়েছে উল্লেখ করে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের বড় সমস্যা হলো, জ্বালানি তেলের কোনো স্থায়ী স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ বা কৌশলগত মজুত নেই, যা কি না পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে রয়েছে। এ ধরনের রিজার্ভ থাকলে সংকটের সময় বাজারে নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব হয়। বর্তমানে প্যানিক বায়িং বা আতঙ্কে কেনাকাটার কারণে চাহিদার চেয়ে বেশি তেল সংগ্রহের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এটি বেড়ে গেলে তাৎক্ষণিকভাবে মেটানো যে কোনো দেশের জন্যই কঠিন। তাই বাজারকে আস্থায় আনা ও নিশ্চয়তা দেওয়া জরুরি। প্রয়োজনে মালয়েশিয়াসহ অন্যান্য বিকল্প উৎস থেকেও জ্বালানি আনার ব্যবস্থা রয়েছে। এখানে মূল লক্ষ্য হলো, জ্বালানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা। আবার বাড়তি দামে জ্বালানি কিনতে রিজার্ভের ওপর যেন চাপ না পড়ে, সেদিকেও সরকারকে নজর রাখতে হবে। সে ক্ষেত্রে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি) থেকে ঋণ নেওয়া যেতে পারে। জ্বালানি তেল কিনতে রিজার্ভের ওপর চাপ কমানো জরুরি।

    বর্তমান সময়ে দেশের ভেতর-বাইরে বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে জানান ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, নীতিনির্ধারকদের জন্য প্রধান অগ্রাধিকার এখন হওয়া উচিত, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা। এর জন্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ লাগবে। আগামী অর্থবছরের বাজেটটি নবনির্বাচিত বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট। এটা সরকারের জন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ, যার মাধ্যমে তারা তাদের নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের সূচনা করতে পারে এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও সরকারি ব্যয়ের দক্ষতার ক্ষেত্রে কার্যকর একটা নেতৃত্ব প্রদর্শন করতে পারে।

     

    সিপিডির এই নির্বাহী পরিচালক বলেন, বাজেটে মূল বিষয় হচ্ছে রাজস্ব আদায়। রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি উল্লেখযোগ্য হারে। চলতি অর্থবছরের জানুয়ারি পর্যন্ত রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি ১২.৯ শতাংশ, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৪.৫ শতাংশ হারে। বাকি সময়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে ৫৯.৪ হারে রাজস্ব আদায় করতে হবে, যা অসম্ভব। কারণ, এখন পর্যন্ত রাজস্ব ঘাটতি ৬০ হাজার কোটি টাকা দাঁড়িয়েছে। বাকি সময়ে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ চ্যালেঞ্জিং বিষয়। রাজস্ব আদায় যেহেতু কম, সে কারণে ব্যাংকের ওপর নির্ভশীলতা অনেক বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকার ব্যাংকিং সেক্টর থেকে ৫৯ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। বিপরীতে ব্যাংক বহির্ভূত ঋণ ও বৈদেশিক সাহায্য উল্লেখযোগ্য হারে কমে গিয়েছে। ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ আর্থিক খাতে ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে, অন্যদিকে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহ কমে গেছে। এই সময়ে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ শতাংশের ওপরে।

    চলমান মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি সংকট অব্যাহত থাকলে মূল্যস্ফীতির অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে উল্লেখ করে ফাহমিদা খাতুন বলেন, জ্বালানির বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। অন্যদিকে বার্ষিক উন্নয়নেও ধীরগতি। জানুয়ারি পর্যন্ত এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল মাত্র ২০.৩ শতাংশ। যা বিগত ১৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। চলতি অর্থবছরে রপ্তানি আয় ৩.২ হারে কমেছে। বিপরীতে জানুয়ারি পর্যন্ত আমদানি বেড়েছে ৩.৯ শতাংশ হারে। আগামী অর্থবছরের বাজেট দেওয়ার সময় উচ্চাভিলাষী প্রবণতা থেকে সরে আসতে হবে। কারণ চলতি অর্থবছরে অনেক বেশি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেও তা অর্জনের কাছাকাছি যেতে পারিনি। যেমন রাজস্ব আদায় একটা উদাহরণ হতে পারে। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আদায় অনেক কম। বর্তমান সরকারের কর ডিজিপি অনুপাতের নির্বাচনী ইশতেহারের লক্ষ্যমাত্রা ১৫ শতাংশ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে চলতি অর্থবছরের কর জিডিপি অনুপাত ৬.৮ শতাংশ। অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় কমাতে হবে। বিনিয়োগ কমেছে, যার সঙ্গে কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে গেছে বলেও জানান এই গবেষক।