শোবিজ জগতের তারকাদের নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা কিংবা গসিপ নতুন কোনো বিষয় নয়। জননন্দিত তারকা হিসেবে তারা যেমন ভক্তদের ভালোবাসায় সিক্ত হন, তেমনি তাদের ব্যক্তিজীবন ও কর্মকাণ্ড নিয়ে সাধারণ মানুষের কৌতূহল থাকাই স্বাভাবিক। তবে সাম্প্রতিক সময়ে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, যৌক্তিক বা তথ্যভিত্তিক কোনো প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেই অনেক তারকা সেটিকে সহজভাবে গ্রহণ করতে পারছেন না। বরং প্রতিবেদন প্রকাশের পরপরই আইনি পদক্ষেপের হুমকি, মানহানির নোটিশ কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাংবাদিকদের প্রতি আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহারের প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে গভীর অস্বস্তি ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি জনপ্রিয় অভিনেত্রী মেহজাবীন চৌধুরীকে কেন্দ্র করে একটি সংবাদ প্রকাশকে ঘিরে এই বিতর্ক নতুন করে দানা বেঁধেছে। একটি জাতীয় দৈনিকে দাবি করা হয়, বিমানবন্দরে মদ বহন সংক্রান্ত জটিলতায় পড়েছিলেন তিনি। সংবাদটি প্রকাশ্যে আসার পরপরই মেহজাবীন এটিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি জানান, তাকে টার্গেট করে মানহানি করার চেষ্টা করা হচ্ছে এবং কোনো প্রমাণ ছাড়াই এমন বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হয়েছে। মেহজাবীনের ভাষ্যমতে, বিমানবন্দরে তাকে কোনো প্রকার জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি বা তার লাগেজ তল্লাশি করে অবৈধ কিছু পাওয়া যায়নি। এই ঘটনায় তিনি আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের ঘোষণাও দিয়েছেন। অন্যদিকে, সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমটি তাদের তথ্যের সত্যতায় অনড় থেকে জানিয়েছে যে, তারা নির্ভরযোগ্য সূত্রের ভিত্তিতেই প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে।
এই ঘটনাটি শোবিজ অঙ্গনের একটি বৃহত্তর সংকটের প্রতিফলন মাত্র। মেহজাবীন ছাড়াও অতীতে পরীমণি, তাসনিয়া ফারিণ ও তানজিন তিশার মতো জনপ্রিয় তারকাদের ক্ষেত্রেও সাংবাদিকদের সঙ্গে একই ধরনের বৈরী আচরণের নজির রয়েছে। ২০২৪ সালে চিত্রনায়িকা পরীমণি একজন নারী সাংবাদিককে হুমকি দিয়ে বিতর্কের জন্ম দিয়েছিলেন। ২০২৩ সালে তাসনিয়া ফারিণ তার বিয়ের গুঞ্জন নিয়ে সংবাদ প্রকাশের জেরে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন। একই বছর অভিনেত্রী তানজিন তিশার বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগে রাজপথে মানববন্ধনও করেছিলেন বিনোদন সংবাদকর্মীরা। এসব ঘটনা শিল্পী ও সাংবাদিকদের দীর্ঘদিনের পেশাদার সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞদের মতে, তারকারা যেহেতু জনস্বার্থের অংশ এবং জনপরিসরে তাদের বিশাল প্রভাব রয়েছে, তাই তাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন ওঠা বা অনুসন্ধান হওয়া সংবাদমাধ্যমের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কোনো সংবাদে ভুল থাকলে সেটি সংশোধন বা প্রতিবাদলিপি দেওয়ার সুস্থ সংস্কৃতি থাকা প্রয়োজন। কিন্তু শুরুতেই আইনি ভয় দেখানো বা সরাসরি ‘হলুদ সাংবাদিকতা’ আখ্যা দিয়ে ব্যক্তিগত আক্রমণ করা স্বাধীন সাংবাদিকতার অন্তরায়। আইনজীবীরা মনে করেন, মানহানিকর সংবাদের বিরুদ্ধে আইনি প্রতিকার পাওয়ার অধিকার সবারই আছে, তবে তা আবেগতাড়িত হয়ে নয় বরং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হওয়া উচিত।
সাংস্কৃতিক বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে যে, দেশের তারকাদের মধ্যে সমালোচনা গ্রহণের মানসিকতা এখনো যথেষ্ট পরিপক্ব হয়নি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনের তারকারা যেখানে কঠিন সমালোচনার মুখেও পেশাদারিত্ব বজায় রাখেন, সেখানে এ দেশের তারকারা সামান্য অভিযোগকেই ব্যক্তিগত শত্রুতা হিসেবে গণ্য করেন। এই প্রবণতা একদিকে যেমন তারকার ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, অন্যদিকে গণমাধ্যমের সঙ্গে তৈরি করে এক ভয়ের দেয়াল। সুস্থ বিনোদন সংস্কৃতির স্বার্থে তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং গঠনমূলক আলোচনার পরিবেশ থাকা জরুরি। আইনি হুমকি নয়, বরং যুক্তি ও তথ্যের ভিত্তিতে জবাব দেওয়াই হতে পারে একজন পরিণত শিল্পীর পরিচয়। অন্যথায় প্রশ্নহীনতার সংস্কৃতি বিনোদন অঙ্গনকে এক সংকীর্ণ ও ভীতিকর পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিতে পারে।







