স্ট্রেচারে ভর করে শহীদ মিনারে শিশুটি, শ্রদ্ধার অনন্য দৃশ্য - NCB News24
ঢাকাশনিবার , ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • আজকের সর্বশেষ সবখবর

    স্ট্রেচারে ভর করে শহীদ মিনারে শিশুটি, শ্রদ্ধার অনন্য দৃশ্য

    এনসিবি প্রতিবেদক
    ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২৬ ১১:৩৭ পূর্বাহ্ণ


    ইজান। বয়স চার কি পাঁচ। পৃথিবীর বড় বড় শব্দগুলো এখনো তার অভিধানে পুরো জায়গা করে নেয়নি। ‘শহীদ’, ‘ভাষা আন্দোলন’, ‘আত্মত্যাগ’—এসব শব্দের গভীরতা সে বোঝে না। কালো ব্যাজ কেন, ফুলের তোড়া কেন, শহীদ বেদিই বা কিসের—এই প্রশ্নগুলোর স্পষ্ট উত্তরও হয়তো তার জানা নেই। তবুও সে এসেছে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে। স্ট্রেচারে ভর করে, বাবার হাতের মুঠোয় ভরসা রেখে, একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছে শহীদ বেদির দিকে।

    চারপাশে তখন মানুষের ঢল। প্রভাতফেরির সুর ভেসে আসছে, মাইকে উচ্চারিত হচ্ছে একুশের অমর বাণী। ফুল হাতে সারিবদ্ধ অপেক্ষা—বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মী, শিক্ষার্থী, পেশাজীবী, সাধারণ মানুষ। সেই ভিড়ের মাঝেই ইজানের ছোট্ট উপস্থিতি যেন নিঃশব্দে আলাদা হয়ে ওঠে। কোলাহলের ভেতরেও তার যাত্রা নীরব, কিন্তু গভীর।

    শহীদ মিনারের পথে এগোনোর প্রতিটি মুহূর্তে বাবার চোখে ছিল এক ধরনের দৃঢ়তা আর কোমল গর্ব। সন্তানের হাত শক্ত করে ধরে তিনি এগিয়ে দিচ্ছেন তাকে ইতিহাসের এক স্পর্শকাতর প্রান্তে। হয়তো ইজান জানে না ১৯৫২ সালের সেই রক্তঝরা ফেব্রুয়ারির কথা, জানে না বুকের তাজা রক্তে রঞ্জিত রাজপথের গল্প। কিন্তু বাবার সঙ্গে শহীদ বেদির সামনে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতাটুকু তার মনে এক অদৃশ্য ছাপ রেখে যাবে এমনটাই বিশ্বাস অনেকের।

    আজ শনিবার মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। ভাষার মর্যাদা রক্ষা ও ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগ স্মরণে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হচ্ছে জাতীয় শোক ও ভাষা দিবস। সকাল থেকেই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন সর্বস্তরের মানুষ। কেউ নীরবে দাঁড়িয়ে, কেউ চোখের কোণে জল লুকিয়ে, কেউবা সন্তানকে কোলে তুলে ইতিহাসের কথা শোনাচ্ছেন।

    এর আগে গতকাল শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টা ১ মিনিটে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানান রাষ্ট্রপতি মো. শাহাবুদ্দিন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতারা। পুষ্পস্তবক অর্পণের পর ভাষা শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় দোয়া করা হয়। রাত পেরিয়ে দিনের প্রথম আলো ফুটতেই সেই শ্রদ্ধার ধারা রূপ নেয় মানুষের অবিরাম উপস্থিতিতে।

    এই আনুষ্ঠানিকতার মাঝেই ইজানের শহীদ বেদির দিকে এগিয়ে যাওয়ার দৃশ্যটি অনেকের মনে দাগ কাটে। ছোট্ট এক শিশু, যে এখনো বুঝে উঠতে পারেনি শোকের রঙ, তবুও অংশ হয়ে ওঠে জাতির স্মরণ ও শ্রদ্ধার মুহূর্তে। তার চোখে হয়তো ছিল কৌতূহল, হয়তো নিছক অনুসরণ। কিন্তু সেই উপস্থিতিই যেন মনে করিয়ে দেয়—ভাষা আন্দোলনের চেতনা কেবল ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়, এটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত এক অনুভূতি।ফুলে ফুলে ঢেকে যাওয়া শহীদ বেদির সামনে দাঁড়িয়ে ইজান হয়তো শুধু বাবার দেখানো পথেই হেঁটেছে। কিন্তু তার এই আগমন যেন নীরবে বলে দেয়, শ্রদ্ধা সবসময় বোঝার অপেক্ষা করে না। কখনো কখনো তা আসে অনুভবে, আসে উপস্থিতির মধ্য দিয়ে।

    শহীদ মিনারের সিঁড়িতে জমে থাকা ফুলের গন্ধ, নীরবতার ভেতর ভেসে আসা গান, আর স্ট্রেচারে ভর করে এগিয়ে চলা এক শিশুর দৃশ্য—সব মিলিয়ে একুশের সকালটি যেন হয়ে ওঠে আরও বেশি মানবিক, আরও বেশি স্পর্শকাতর। ভাষা শহীদদের প্রতি জাতির শ্রদ্ধার ভিড়ে ইজানও রেখে যায় তার ছোট্ট কিন্তু অনন্য এক ছাপ।

    প্রতিবেদক/কাউছার